প্রাচীন ইসলামী রাজনৈতিক দল জমিয়তের কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠক সম্পন্ন : কর্মীদের প্রতি গণসম্পৃক্ততা বাড়াতে গুরুত্বারোপ

বাংলাদেশ রাজনীতিক

আলীনগর দর্পণ ডেস্ক : শতবর্ষ প্রাচীন ইসলামী রাজনৈতিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ-এর মজলিসে আমেলা (কার্যনির্বাহী পরিষদ)এর বৈঠক আজ রবিবার (৪ অক্টোবর) সকাল ১০টায় রাজধানী ঢাকার পল্টনস্থ দলীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেছেন দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল্লামা শায়েখ জিয়া উদ্দিন।

শুরুতে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বৈঠকের কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর দলের মহাসচিব আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী স্বাগত বক্তব্য দেন। শুরুতেই সদরে জমিয়ত শায়খুল হাদীস আল্লামা আব্দুল মুমিন শায়খে ইমামবাড়ী (রাহ.), খলিফায়ে মাদানী আল্লামা শাহ আহমদ শফী (রাহ.), শায়খুল হাদীস আল্লামা তাফাজ্জুল হক হবিগঞ্জি (রাহ.) এবং মাওলানা জুবায়ের আহমদ আনসারী (রাহ.) প্রমুখ শীর্ষ উলামায়ে কেরামের ইন্তিকালে দলের পক্ষ থেকে বৈঠকে শোক প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং তাঁদের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মুনাজাত করা হয়। মুনাজাত পরিচালনা করেন দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল্লামা শায়েখ জিয়া উদ্দীন। এরপর বৈঠকের অন্যান্য কার্যক্রম শুরু হয়।

সভাপতির বক্তব্যে আল্লামা শায়েখ জিয়া উদ্দিন বলেন, জমিয়ত আমাদের পূর্বসুরী আকাবিরগণের রেখে যাওয়া আমানত এবং ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল। দলের সকল নেতাকর্মীর মনে এই আমানতের হেফাজতে দৃঢ়কদমে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় থাকতে হবে। নিজেদের মধ্যে মজবুত ঐক্য, খালেস নিয়্যাত এবং লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প থাকতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত ধর্মভীরু এবং দেশের বেশির ভাগ নাগরিক জুলুম-অত্যাচার থেকে মুক্তি এবং সর্বস্তরে সুবিচার ও ইনসাফ কায়েমের জন্য ইসলামী হুকুমত কায়েমের পক্ষে। আপনারা যদি দলের লক্ষ্য আল্লাহর জমিনে আল্লাহর নেজাম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে যান, ব্যাপক গণসংযোগ করেন এবং নিরলসভাবে গণমানুষের সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দলের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে তুলে ধরতে পারেন, ইনশাআল্লাহ জমিয়ত ইসলামী হুকুমত কায়েমের অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হবে।

তিনি বলেন, দলের সকল নেতা-কর্মীদের মধ্যে ত্যাগের সর্বোচ্চ মানসিকতা থাকতে হবে। দলীয় শৃঙ্খলা ও আনুগত্য শতভাগ বজায় রেখে ত্যাগী মানসিকতা নিয়ে নিরলস কাজ করে যাবেন। মনে রাখবেন, সফলতা দেওয়ার দায়িত্ব আল্লাহর, আমাদের কাজ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া এবং মু’মিনদের কাজের বিনিময় পরকালে।

তিনি বলেন, আগামীতে জমিয়তকে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে আমরা সকলে এখান থেকেই শপথ নিয়ে যাব যে, ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে গিয়ে যে কোন মূল্যে আমরা জমিয়তকে এগিয়ে নিতে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করবো। আমাদের কর্মস্পৃহা বাড়াতে হবে, আমাদেরকে মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে হবে।

বৈঠকে মহাসচিব আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী বলেন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম দারুল উলূম দেওবন্দের আকাবিরগণের পবিত্র আমানত। দ্বীনের দাওয়াত তথা প্রচার-প্রসার, সঠিক পদ্ধতিতে দ্বীনি ইলমের বিস্তার এবং সুন্নাত যিন্দা, আত্মশুদ্ধি ও বাতিলের মোকাবেলার ক্ষেত্রে যেমনিভাবে আমরা দারুল উলূম দেওবন্দকে অনুসরণ করি, তেমনিভাবে দেশ ও সমাজ গঠনসহ রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ দারুল উলূম দেবওন্দের পবিত্র আমানত হিসেবে দেওবন্দী আকাবিরগণের অনুসরণ অনুকরণ করে থাকে। এই  আমানতকে যথাযথভাবে হেফাজত করা এবং পরিচালনা করা আমাদের সকলের ঈমানী দায়িত্ব।

তিনি উপস্থিত নেতৃবৃন্দকে উদ্দেশ্য করে বলেন, জমিয়তের পতাকাতলে সর্বোচ্চ সংযম, চেষ্টা-সাধনার মাধ্যমে ইসলামের সুন্দর ও ইনসাফপূর্ণ সমাজ কায়েমের লক্ষ্যে কাজ করে যেতে হবে। উলামায়ে কেরাম সাধারণ জনতাকেও মুকতাদি হিসেবে সাথে রাখতে হবে। সাধারণ জনতার সাথে আলেমদের সম্পর্ক আরো নিবিড় করে তুলতে হবে। কারো সমালোচনা, গীবতের পেছনে একটুও সময় নষ্ট করবেন না। কারো মুখাপেক্ষী না থেকে সকল প্রকার হীনমন্যতা দূরে সরিয়ে দলীয় শৃঙ্খলার আওতায় থেকে একমাত্র আল্লাহকে রাজী-খুশী করার উদ্দেশ্যে দলের জন্য কাজ করে যাবেন। ইনশাআল্লাহ এতে করে দলে সফলতা আসবে।

সহসভাপতি মাওলানা আবদুর রব ইউসুফী বলেন, সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফ যেহারে বাংলাদেশী নাগরিকদেরকে পাখির মতো হত্যা করছে, এটা বন্ধে সরকার কিছুই করছে না। নেপাল-ভূটানের মতো দেশও ভারতের ছোট-খাটো অন্যায়েও গর্জে ওঠে প্রতিবাদ করে, অথচ ভারত বাংলাদেশের উপর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালাচ্ছে, সীমান্তে নির্বিচারে আমাদের নাগরিকদের হত্যা করছে। কিন্তু সরকার সম্পূর্ণ নিশ্চুপ থেকে কার্যত: সায় দিয়ে যাচ্ছে। জমিয়তের নেতাকর্মীদেরকে দেশের স্বার্থ রক্ষায় মানুষকে সচেতন করতে হবে এবং আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে দেশের স্বার্থ রক্ষায় শক্ত অবস্থান নিতে বাধ্য করতে হবে।

মাওলানা ইউসুফী বলেন, দেশে ক্রমবর্ধমান ধর্ষণ ও গণধর্ষণের মতো অপরাধে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, শুধু ধর্ষণের বিচার চাইলে বা কয়েকটা অপরাধীকে শাস্তি দিলে এই বর্বরতা বন্ধ হবে না। এজন্য আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মীয় ও নৈতিকতার শিক্ষা যুক্ত করে ঢেলে সাজাতে হবে। ব্যভিচার বন্ধে শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। সহশিক্ষা বন্ধ করে সকল স্তরে পৃথক শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে হবে। পাশাপাশি পৃথক কর্মসংস্থান ও নগর চলাচলে পৃথক যানবাহনের ব্যবস্থা করতে হবে। বিয়ে ব্যবস্থায় বয়স ও অন্যান্য সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে।

সহসভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক বলেন, দলীয় কার্যক্রমকে আরো গতিশীল করতে মূল দলের পাশাপাশি অঙ্গ সংগঠন তথা ছাত্র জমিয়ত ও যুবজমিয়তের কাজে গতি আনতে হবে। বিশেষ করে রাজধানী সহ দেশের প্রতিটি মহানগরের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কমিটি করে সাংগঠনিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠানে কমিটি নেই, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেখানে কাজ করতে হবে। সর্বত্র মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায়-ইনসাফ ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব তরুণ ও যুবাদেরকে বুঝাতে হবে। জাতীয় ও সামাজিক কর্মকান্ডের সাথে কর্মীদেরকে অধিক সম্পৃক্ত হতে হবে। মানবাধিকার ও সেবামূলক কাজে সহযোগী হয়ে কাজ করতে হবে। শুধু বক্তৃতা-বিবৃতি নয়, কাজের মাধ্যমে দেশ ও জাতির প্রতি দরদের প্রমাণ দিতে হবে। ইনশাআল্লাহ, তাতে দলের সফলতা দ্রুত আসবে।

বৈঠকে দেশব্যাপী দলীয় কার্যক্রমকে আরো গতিশীল করতে বেশ কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। বিশেষ করে যে কয়েকটি জেলায় এখনো কমিটি গঠনের কাজ বাকী, দ্রুত সময়ের মধ্যে সেখানে কমিটি গঠনের কাজ শেষ করতে দায়িত্ব বণ্টন করা হয়। এছাড়া দেশব্যাপী সাংগঠনিক সফর বৃদ্ধি এবং তৃণমূল পর্যায়ে কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ বৃদ্ধির প্রতি গুরুত্ত্বারোপ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

জমিয়তের যুগ্মমহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দীর সঞ্চালনায় দলের আমেলা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মহাসচিব আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী, সহসভাপতি মাওলানা আব্দুর রব ইউসূফী, মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক, মাওলানা জোনায়েদ আল-হাবীব, মাওলানা আনোয়ারুল করিম, মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস, এ্যাডভোকেট মাওলানা শাহীনুর পাশা চৌধুরী, যুগ্মমহাসচিব, মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া, মাওলানা তাফাজ্জুল হক আজিজ, মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ জামী, মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী, সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা নাজমুল হাসান, সহকারী মহাসচিব মাওলানা মাসুদুল করীম, মাওলানা খলিলুর রহমান, মাওলানা খলিলুর রহমান বিক্রমপুরী, মাওলানা আতাউর রহমান কোম্পানীগঞ্জ, মাওলানা সানাউল্লাহ মাহমুদী, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মতিউর রহমান গাজীপুরী, মাওলানা নাসির উদ্দিন মুনির, অর্থ-সম্পাদক মুফতি জাকির হোসাইন কাসেমী, সাহিত্য সম্পাদক মাওলানা ফয়জুল হাসান খাদিমানী প্রচার সম্পাদক মাওলানা জয়নুল আবেদীন, প্রশিক্ষণ সম্পাদক মাওলানা আনোয়ার মাহমুদ, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মাহবুবুল উল্লাহ, মাওলানা আব্দুর রহমান ছিদ্দীকি, মাওলানা বশির আহমদ, মাওলানা আফজাল হোসেন রহমানী, মুফতি নাছির উদ্দিন খান, দাওয়া বিষয়ক সম্পাদক মাওলানা লোকমান মাজহারী, কৃষি বিষয়ক সম্পাদক মাওলানা জিয়াউল হক কাসেমী, তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক মাওলানা শরফউদ্দীন ইয়াহিয়া ফাহাদ, শ্রমবিষয়ক সম্পাদক মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান, দফতর সম্পাদক মাওলানা আব্দুল গফফার ছয়ঘরি, যুব বিষয়ক সম্পাদক মাওলানা তাফহিমুল হক, সহকারী প্রশিক্ষণ সম্পাদক মাওলানা আব্দুল জলীল ইউসূফী সহ কার্যনির্বাহী পরিষদ (মজলিসে আমেলা)এর প্রায় শতাধিক সদস্য।

43

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *