যৌতুক ও ইফতারি প্রথা সমান্তরাল ভাবে চলমান দু’টি সামাজিক ব্যাধি : এ এম মুহিবুল হাছান

তথ্য প্রযুক্তি

আমাদের সমাজে বিদ্যমান যৌতুক একটি সামাজিক ব্যাধি, যৌতুক একটি সামাজিক অবক্ষয়ের নিয়ামক, যৌতুক একটি সামাজিক অভিশাপ যেভাবেই বিশ্লেষণ করা হোক না কেন যৌতুক কোনভাবেই সমাজের জন্য মঙ্গলজনক তো নয়ই বরং ক্ষতি ছাড়া এর কোন ভাল দিক নেই। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় পণপ্রথা থেকেই যৌতুকের উৎপত্তি। আমাদের বঙ্গভূমিতে রাজা বল্লাল সেনের আমল থেকে কৌলিণ্য প্রথার ফলে কুলীন পাত্রের চাহিদা বিয়ের বাজারে বেড়েছিল অস্বাভাবিক রকম। কন্যা অরক্ষণীয়া হওয়ার আগে পাত্রস্থ করে সামাজিক নিপীড়ন থেকে পরিত্রাণ পেতে চাইতেন পিতা-মাতা। মোটা অর্থ প্রাপ্তির চুক্তিতে তাই কুলীন বংশীয় পাত্রের সাথে কন্যাদান করা হতো। আর এই পণপ্রথা বা যৌতুক প্রথা আমাদের দেশে বহুদিন আগে থেকেই প্রচলিত। মানুষের অর্থের লোভ-লালসা থেকে যৌতুক প্রথার সৃষ্টি। দারিদ্র্য বা আর্থিক দুরবস্থাও যৌতুক প্রথা সম্প্রসারিত হওয়ার প্রধান কারণ গুলোর একটি। এছাড়া যৌতুক প্রথার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অনেক গুলো কারণ জড়িত। তার মধ্যে কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাস, সামাজিক প্রতিপত্তি ও প্রতিষ্ঠা লাভের মোহ, দারিদ্র্য, অজ্ঞতা, উচ্চ বিলাসী জীবন যাপনের বাসনা, নারীদের অর্থনৈতিক পরনির্ভরশীলতা, অধিকারহীনতা এবং অশিক্ষাই প্রধান কারণ বলে বিবেচ্য। যৌতুক প্রথার নিষ্ঠুরতা, নৃশংসতা ও নারী নির্যাতন আজকাল সর্বজন বিদিত। বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপের মাধ্যমে দেখা গেছে নারী বিশেষ করে বিবাহিত নারীদের উপর নির্যাতন হয় সবচেয়ে বেশি। আর এই নির্যাতনের অন্যতম কারণ যৌতুকের লালসা, যৌতুকের কারণে অনেক সংসার ধ্বংস হয়ে গেছে, যাচ্ছে। মৃত্যুর হাতছানি নেমে আসছে অনেক নারীর উপর। যৌতুকের বিষক্রিয়ায় সমাজে সৃষ্টি হচ্ছে চরম অস্থিরতা। যে কোন মিডিয়াতে একদিনও বাদ পড়ে না যৌতুকের কারণে নারী নির্যাতনের খবর। বরং দিনকে দিন এটা আরও প্রসার লাভ করছে এবং চরম আকার ধারণ করছে। যৌতুক প্রথা অত্যন্ত অমানবিক ও জঘন্য একটি সামাজিক অপরাধ। এটি নারীর মৌলিক অধিকার ক্ষুন্ন করে। মানুষ হিসেবে সমাজে নারীকে মর্যাদা দেয়ার ক্ষেত্রে যৌতুক প্রথা বড় একটি বাধা। যৌতুক প্রথার দংশনে সংশ্লিষ্ট পরিবার গুলোকে করেছে বিপর্যস্ত, সমাজকে করেছে কলুষিত, রাষ্ট্রকে করেছে পশ্চাৎপদ এবং সভ্যতাকে করেছে কলংকিত। কাজেই এই মানবতা বিরোধী কুপ্রথার অবসান হওয়া চাই। যৌতুক নামক এ সামাজিক ব্যাধিকে এখনই নিয়ন্ত্রণ এবং নির্মূল করতে না পারলে তা আমাদের অগ্রযাত্রাকে চরম ভাবে ব্যাহত করবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

এটা হলো প্রত্যক্ষ যৌতুকের কারণে নারীদের সামাজিক অবস্থান। কিন্তু পরোক্ষ ভাবেও অনেক যৌতুক আছে যা নারীদের মূল্যায়ন বাড়ানোর বদলে অবমূল্যায়নেই সাহায্য করে। আর এই পরোক্ষ যৌতুক প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেট অঞ্চলেই বেশি এবং সেটা বিশেষত- দুইভাবে প্রচলিত; এক- পবিত্র রমজান মাসে আর দুই- রমজান মাস ছাড়া জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে। যখন গ্রীষ্মের ফল-মূল বাজারে আসে তখন যে কোনদিন মেয়ের বাবার বাড়ি থেকে সবধরণের ফল-মূলের সাথে খৈ, মুড়ি, মোয়া ইত্যাদি এবং আরও হরেক পদের খাদ্য সামগ্রী মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে উৎসবের আমেজে গাড়ি ভর্তি করে পাঠানো হয়। সেটাকে সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় ‘আম-কাঠলি’ বলে। একেক সময় এই ‘আম কাঠলি’র পসরা দেখলে রীতিমত ভিমরি খাওয়ার উপক্রম হয়। আর রমজান মাসে যেটার প্রচলন সেটা বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের ভিতরে ‘ইফতারি’ নামে পরিচিত। এই দুই প্রথা সিলেট অঞ্চলের পারিবারিক জীবনে আষ্টে পৃষ্ঠে গেঁথে আছে যার কারণে অনেকে এই দুই প্রথাকে সিলেটের ঐতিহ্য বলেও মনে করেন। যেহেতু রমজান মাস তাই এই ‘ইফতারি’ প্রসঙ্গেই আসা যাক।

সাধারণত সারাদিন রোজা থেকে সন্ধ্যায় নাগরিবের আজানের পর রোজা ভাঙ্গার জন্য কাজকে ইফতার এবং যে খাবার খাওয়া হয় তাকে ইফতারি বলে। আবার রমজান মাসে মেয়ের বাবার বাড়ি থেকে নানা ধরনের ইফতার সামগ্রী ঘটা করে মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে পাঠানোর নাম ‘ইফতারি’। আর এই ‘ইফতারি’ যার-যার অঞ্চল ভিত্তিক নিয়ম অনুসারে পাঠানো হয়ে থাকে। কেউ রমজানের প্রথমদিন একবার এরপর আরও দুই-তিন বার ঘটা করে পাঠিয়ে থাকেন। মেয়ের পিতামাতা, আত্মীয়-স্বজন যে যেভাবে পারেন এই নিয়ম পালন করে থাকেন। তবে আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে পাঠানো হোক বা না হোক পিতা-মাতার কাছ থেকে এটা পাঠানো যেন অনেকটা বাধ্যতামূলক। ইফতারি যেন একটি রীতিগত প্রথা। সিলেট অঞ্চলের বাইরে যারা তাদের এই প্রচলনের সাথে পরিচিতি নাই বললেই চলে। এই ‘ইফতারি’ হতে পারে কিছু ঘরে তৈরি আবার কিছু বাইরে থেকে কেনা এবং সেটা নির্ভর করে যার-যার সামর্থ্যর উপর। সামর্থ্যর উপর বললেও ভুল হবে। কারণ অনেক সময় দেখা যায় সামর্থ্য না থাকলে বা কম থাকলেও অনেক কষ্টে ব্যবস্থা করে মেয়ের বাবার বাড়ি থেকে এটা পাঠানো হয়। কোন-কোন সময় মেয়ের শ্বশুরবাড়ি থেকে মেহমানদের তালিকা নির্ধারণ করে দিয়ে এই কষ্টের মাত্রা যেন আরও বাড়িয়ে দেয়া হয়। আর এই রেওয়াজ যুগ-যুগ ধরেই চলে আসছে। উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের মধ্যে এই রেওয়াজ সবচেয়ে বেশি। তবে নিম্ন বিত্তেরও নেই বলা চলে না। ওরাও ওদের সাধ্য অনুযায়ী এটা পালন করে আসছে।
এটা এমন এক রেওয়াজে পরিণত হয়েছে যে অনেক সময় দেখা যায় শুধু বিয়ের পর নয় আকদ বা পানচিনি হয়ে গেলেই মেয়ের বাবার বাড়ি থেকে এটা আসতেই হবে যেন মেয়ের বাবার বাড়ির জন্য মেন্ডাটরি। উচ্চবিত্তরা এই খাতে কি পরিমাণ অর্থ যে ব্যয় করেন তার কোন হিসাব রাখার দরকার আছে বলে উনারা মনে করেন না। বেহিসেবী খরচ করেন। উনাদের ধারণা হলো যত বেশী খরচ করা যাবে ততই সুনাম বাড়বে এবং মেয়ের মুখ উজ্জ্বল হবে। আর এই উচ্চবিত্তদের অধিকাংশই হলেন প্রবাসী। অনেক সময় দেখা যায় মেয়ে জামাই দেশেই নেই তারপরও মেয়ের শ্বশুর-শাশুড়ি বা শ্বশুরশাশুড়ি না থাকলে দেশে জামাইর ভাই-বোন বা যারা থাকেন তাদেরকে এই ‘ইফতারি’ দেয়া হয়, দিতেই হবে। এমনকি সিলেট অঞ্চলের যারা প্রবাসে আছেন উনারা সেখানে থেকেও এই নিয়ম পালন করে আসছেন। অনেক ক্ষেত্রে এমনও দেখা যায় দেশে ইফতারি নিয়ে যাওয়ার কেউ না থাকলে টাকা পাঠিয়েও এই কর্তব্য পালন করা হয়। তারপর হলো মধ্যবিত্তদের কথা। যুগের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে গিয়ে মধ্যবিত্ত শ্রেণির পিতা-মাতাদেরও এই নিয়ম পালন করতে হয়। না হলে সে মেয়ের মুখ রক্ষা হবে না। আর এই মুখরক্ষা করতে গিয়ে পিতা-মাতার খরচের বোঝা যে কেমন হয় সেটা একমাত্র ভুক্তভোগীরাই ভাল বুঝতে পারবেন। আর কেউ যদি অধিক কন্যা সন্তানের পিতামাতা হন তাহলে উনাদের অবস্থা আরো শোচনীয় হয়ে ওঠে। আবার এমনও দেখা যায় যে-কোন পরিবারে মেয়ের মা-বাবা না থাকলেও সেই দায়িত্ব এসে বর্তায় ভাইদের উপর বা চাচা, মামা, খালা, ফুফু উনাদের উপর অর্থাৎ যেভাবেই হোক নিয়ম রাখতে হবে, নিয়মের ব্যত্যয় ঘটানো যাবে না। আবার মেয়ে যদি যৌথ পরিবারে বিয়ে দেয়া হয় তবে সেখানে তো মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে রীতিমত প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। শ্বশুরশাশুড়ি যদি পুত্রদের নিয়ে একসাথে বসবাস করেন তবে অনেক ক্ষেত্রে উনাদের মধ্যেও কোন পুত্রের শ্বশুরবাড়ি থেকে কি রকম ‘ইফতারি’ আসে এই নিয়ে চাপা প্রতিযোগিতা চলে। এই প্রতিযোগিতার নোংরা মনোভাব যেমন পুত্রদের মধ্যে থাকে তেমনি থাকে বউদের মধ্যেও। আর এই ক্ষেত্রে বিত্তশালী পিতা-মাতার কন্যা সন্তানের প্রাধান্যই বেশি থাকে, তাদের অন্তরে অন্যরকম এক অহমিকা কাজ করে। মধ্যবিত্ত বা যাদের একটু কম আসে সেইক্ষেত্রে পুত্র বা পুত্রবধুকে কটাক্ষ করতেও কেউ কুন্ঠাবোধ করেন না। যার কারণে এই মধ্যবিত্ত পিতা-মাতার কন্যাকে অনেকটা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হতে হয়। আর এর প্রভাব এই মেয়ের সন্তানদের উপরও পড়তে দেখা যায়। তবে দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, কোন মেয়ের শ্বশুরবাড়ি থেকে কখনো জোরালো ভাবে এই ‘ইফতারি’ দিতে নিষেধ করা হয় না। যার কারণে এই রেওয়াজ যুগ-যুগ ধরে চলতেই আছে। সেটা কখনও স্বেচ্ছায় আবার কখনও বাধ্য হয়ে। আবার সিলেট অঞ্চলেই একেক এলাকায় একেক ধরনের ইফতারির রেওয়াজ আছে। যেমন শহর ভিত্তিক রেওয়াজ একরকম আবার গ্রামাঞ্চলে অন্যরকম। এই শহর ও গ্রামভিত্তিক রেওয়াজেও আবার অঞ্চল ভেদে পার্থক্য আছে। এই ইফতারি নিয়ে অনেক পূর্বে কোন এক সময় এক গ্রামে নাকি এক মজার ঘটনা ঘটেছিল যা দাদী-নানীর কাছে শোনা। মজার ঘটনার জন্য সেই গ্রামকে নাকি ব্যঙ্গ করে ডাকা হতো ‘ইস্তারিগাঁও’। দাদী-নানীর কাছ থেকে শোনা গল্প থেকেই অনুমান করা যায় যে এই ‘ইফতারি’র প্রচলন অনেক প্রাচীন এবং এই প্রচলনকে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে অনেক পূর্ব থেকেই।
এই ইফতারি নিয়ে আমার নিজের দেখা একটি বাস্তব ঘটনা-‘রমজান মাসে অফিস থেকে এসে বাড়িতে না গিয়ে বাজারেই যেতাম উদ্দেশ্য আছর নামায পড়ে ইফতার সময় ঘনিয়ে এলে পরেই বাড়ি যাবো। গত বছর রোজার মাসে ১৩ বা ১৪ রোজার দিন হবে বাজারে এসে তামান্না রেস্টুরেন্টে বসে গল্প করছি। এমন সময় একজন ষাটোর্ধ বয়সী লোক আসলেন। তিনি ইফতারি কিনবেন। বার-বার দাম জিজ্ঞেস করছেন আর হাতের আঙ্গুলে কি যেন গুনছেন। দাম কম রাখার জন্য কাকুতি-মিনতি করেই যাচ্ছেন। ইফতারি কিনা শেষ হলে আমি কাছে ডাকলাম। জিজ্ঞেস করতেই দু’চোখের জল মুছতে-মুছতে বললেন মেয়ের বাড়ি ইফতারি নিয়ে যাবেন আজ ১৩/১৪ রোজা হয়ে গেছে মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকেরা নাকি ইফতারির জন্য মেয়েকে খোটা দিচ্ছে। কিন্তু টাকার জন্য দিতে পারছিলেন না। এখন টাকা কিভাবে ব্যবস্থা করলেন- প্রশ্নটির উত্তরে সেই চাচা মিয়া যা বললেন শুনে নিজের হিতাহিত জ্ঞান যেন হারিয়ে ফেলি। বাড়ির ছোট একটি কদমগাছ বিক্রি করে কটা টাকা পেয়েছেন, আর শ্বশুরবাড়ি মেয়ের মুখ উজ্জ্বল করতে তাই এই কটা টাকায় মেয়ের বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন ইফতারি”। এই গল্পের অর্ন্তনিহীত ভাব কত মর্মান্তিক আর অমানবিক সহজে কি অনুমেয় নয়? একজন দারিদ্র্য পিতার অসহায়ত্বের নির্মম দীর্ঘশ্বাসে ফুটে উঠে প্রচলিত এক অমানবিক প্রথার চিত্র।

যাই হোক এই ‘ইফতারি’ কিন্তু এক ধরনের যৌতুকের পর্যায়ে পড়ে এবং সেটা পরোক্ষভাবে শুধু সিলেট অঞ্চলে। যে কোন নিয়ম বা প্রথা একদিনে বা হঠাৎ করে বন্ধ করা যায় না এটা ঠিক। কিন্তু চেষ্টা করলে অনেক দিনের পুরনো অযৌক্তিক প্রথাও রোধ করা সম্ভব হয় এবং সেটা সর্বসম্মতভাবে এবং সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও আন্তরিকতায়। হোক না এটা সিলেট অঞ্চলের পুরনো প্রথা। এটা প্রতিরোধ করা সম্ভব হলে অনেক অস্বচ্ছল পিতা-মাতা অহেতুক একটি আর্থিক ও মানসিক কষ্ট থেকে রেহাই পেতে পারেন। যুগের সাথে সবকিছু বদলায়। মানুষের আচার ব্যবহার, রীতিনীতি, শিক্ষা ব্যবস্থা, চিন্তাধারা, সামাজিক পটভূমি সবকিছুর পরিবর্তন যুগের বিবর্তনের সাথে ঘটে থাকে। সবকিছু যদি যুগের বিবর্তনের সাথে পরিবর্তিত হতে পারে তবে এই উন্নয়নশীল সমাজে মান্ধাতা আমলের এই প্রথা অবশ্যই রোধ করা সম্ভবপর হতে পারে সেটা ঋতুভিত্তিক ‘আম কাঠলি’ বা রমজান মাসের ‘ইফতারি’ যাই হোক না কেন। এগুলো রোধ করার এখনও সময় আছে। আর এখনও যদি এই প্রথাগুলো প্রতিরোধের কোন চেষ্টা করা না হয় তবে বংশ পরম্পরায় এগুলো চলতেই থাকবে। এটা রোধ করা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নির্ভর করে জামাই বাবুদের উপর। আমাদের জাতীয় কবির সেই কালজয়ী পংক্তি আবারো স্মরণ করিয়ে দিতে হয়-‘এই বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর’। কল্যাণকর কিছু করার দাবীদার যদি নর ও নারী উভয়েই সমান হয়ে থাকেন তবে জামাই বাবুরাও এই কল্যাণকর কাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারেন। কারণ এখানে উনাদের ভূমিকাই মুখ্য। জামাইকে কেন্দ্র করেই এই ‘ইফতারি’র আয়োজন সাথে থাকেন জামাইর আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, এখানে মেয়েদের প্রতিবাদ কার্যকরী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে না যদি জামাই বাবুরা সাথে না থাকেন। আর মেয়েরা বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়িয়ে যাওয়ার জন্য এই ব্যাপারে প্রতিবাদী নাও হতে পারেন। তাই জামাই বাবুরা সচেতন হলে এবং সর্বোপরি সকলের উদার মানসিকতায় এই প্রথা রোধ করা অনেকটা সম্ভবপর হতে পারে।
মেয়ে হয়ে জন্ম নেয়া কোন অপরাধ নয় বা কন্যা সন্তান জন্ম দেয়ার কারণে পিতা-মাতা কোন ভাবেই দায়ী হতে পারেন না। মেয়ে হয়ে জন্ম নেয়ার কারণে সব দায়বদ্ধতা শুধু মেয়ে এবং মেয়ের পিতা-মাতার হতে পারে না। কন্যা সন্তান হয়ে জন্ম নেয়ার কারণেই হয়তোবা এই ‘ইফতারি’ নামক বোঝাও পিতা-মাতার উপর একটা বাড়তি চাপের সৃষ্টি করে যা কোন ভাবেই উচিত নয়। আমাদের সমাজে নারী যতবড় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাই হোন না কেন বা যতই অর্থনৈতিক নিরাপত্তা থাকুক না কেন ঘরে বাইরে নারীকে মানুষ হিসেবে নয় সেই নারী হিসেবেই দেখা হয় যার কারণে শৈশব থেকে নারীদের পদে-পদে বিপদ, অপবাদ, নির্যাতন, গঞ্জনার শিকার হতে হয়।

পবিত্র রমজান মাসে আরেকটি লক্ষণীয় ব্যাপার হলো আড়ম্বরপূর্ণ ইফতার মাহফিলের নামে অযথা খাবারের অপচয়। আল্লাহ তায়ালা অপচয়কারীকে কখনো পছন্দ করেন না একথা আমাদের সর্বক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে। তাই পবিত্র কোরআনে বলেছেন- “তোমরা খাও এবং পান করো, তবে কোনো অবস্থাতেই অপচয় করো না, কেননা আল্লাহ তায়ালা কখনো অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না”- সূরা আল আ’রাফ।
সিয়াম সাধনায় আত্মশুদ্ধি ও সংযমের মাস পবিত্র রমজান মাস। দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক সবকিছুর প্রেক্ষাপটে দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক উর্ধ্বগতির কারণে যেখানে সাধারণ ভাবে জীবনযাপন করতে গিয়েই সবার নাভিশ্বাস উঠছে সেখানে এই ‘ইফতারি’র কারণে অনেকের অবস্থা আরও শোচনীয় যা বলাও যায় না সওয়াও যায় না। তাই বৈশ্বিক দূর্যোগময় এই কঠিন সময়ে সমাজে প্রচলিত চলমান এই ইফতারি নিয়ে ‘হৈ-হৈ কান্ড না করে আসুন সবাই মিলে নিজ অবস্থান থেকে এই তথাকথিত ‘ইফতারি’ কে বর্জন করি। ইফতারি প্রথাকে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টায় পরিহার করে পবিত্র রমজান মাসে কন্যা সন্তানের পিতা-মাতার মাথায় আর্থিক ও মানসিক চাপ কিছুটা হলেও লাঘব করার চেষ্টা করি যা হবে সবার জন্য মঙ্গলজনক ও কল্যাণকর একটি প্রচেষ্টা।

লেখক: মানবাধিকার কর্মী, তরুণ প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।

29

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *