মহামারী করোনাঃ পরিণতি ঠেকাতে পারবে কি দেশ? : এ এম মুহিবুল হাছান

Uncategorized

: এ এম মুহিবুল হাছান

বৈশ্বিক মহামারী (Epidemic) কভিড-১৯ (nCov-19) করোনা ভাইরাস ইতিমধ্যেই সমগ্র দুনিয়ায় মরণঘাতী আক্রোশে প্রায় ২৬ লাখ মানুষকে আক্রান্ত করে ১ লক্ষ ৮১ হাজারের মতো মানুষের প্রাণহানী করেছে। আমাদের প্রিয় বাংলাদেশে গত কয়েকদিন ধরে জ্যামিতিক হারে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে এবং মৃতের সংখ্যাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। এই অবস্থায় বিশেষজ্ঞদের মত, মহামারীর অন্ধকার গহব্বরে বাংলাদেশের প্রবেশ এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। অনেক বিশেষজ্ঞ আবার বলছেন, বাংলাদেশে ইতিমধ্যে করোনার মহামারী শুরু হয়ে গেছে। বিপুল সংখ্যক রোগী পরীক্ষা করা গেলে এখন বোঝা যাবে বাংলাদেশে মহামারীর অবস্থা বিরাজ করছে। এই অবস্থায় আমাদের করণীয় কী?
মহামারী মোকাবেলার জন্য যে সুযোগ বাংলাদেশ পেয়েছে, সেই সুযোগ কাজে লাগাতে আমরা ব্যর্থ হতে পারিনা।মহামারীর অন্ধকার টানেল থেকে বেরিয়ে আমাদের আসতেই হবে এবং সেই বেরিয়ে আসার জন্য আমাদের কিছু ন্যুনতম ছাড় দেওয়ার অবকাশ নেই। এই সুযোগ হাতছাড়া করার অবকাশও আমাদের নেই।
এখন প্রশ্ন হলো মহামারী প্রতিরোধের জন্য আমাদের কি করতে হবে? চিকিৎসক এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী বলা যায়-
✪ আক্রান্ত রুগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতেই হবে। আমরা যতই বলি না কেন আমাদের হাসপাতাল প্রস্তুত, আমাদের পর্যাপ্ত পরিমাণ ভেন্টিলেশন আছে, সরঞ্জামাদি আছে। কিংবা আমাদের আইসিইউ অভাব নেই- কিন্তু আমাদের বাস্তবতার চিত্র একেবারেই সম্পুর্ণ ভিন্ন। পর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। সব প্রস্তুতি আছে বলে কর্তৃপক্ষের নীরবতা অনেক মানুষের জীবনকে মৃত্যুর মতো ভয়াবহ খেলায় রুপান্তরিত করে ফেলবে। চিকিৎসার দিক দিয়ে আমাদের প্রস্তুতি আদতে অনেক কম অপ্রতুল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর তাই মহামারী প্রতিরোধে আমাদের প্রথম যেটা করতে হবে সেটা হলো সবার জন্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতেই হবে। চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে আমাদের এখনো যা করা প্রয়োজন-

☞ আমাদের বিশেষায়িত হাসপাতাল গুলোকে এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে করোনা চিকিৎসার জন্য সুসজ্জিত করতে হবে এবং উপযুক্ত যন্ত্রপাতি সরঞ্জামাদির ব্যবস্থা করতে হবে।

☞ আমাদের হাসপাতাল সমূহে নিয়মিত স্বাস্থ্যকর্মী, চিকিৎসক, নার্সসহ যারা করোনার চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। কেননা ইতিপূর্বেই চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন মারাও গেছেন। তাই তাদের সুরক্ষিত করে আরো বেশী মানসিক ভাবে সমৃদ্ধ মনোবলে বলিয়ান এবং পর্যাপ্ত উপকরণ দিয়ে প্রস্তুত করতেই হবে।

☞ বেসরকারি হাসপাতাল গুলোকে কীভাবে করোনা চিকিৎসায় সম্পৃক্ত করা যায় তাদেরকে অনুপ্রাণিত করতে হবে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামাদি প্রদান করা যেতে পারে। সে বিষয় নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

☞ করোনা রোগের পরীক্ষার ব্যাপ্তি আরো অনেক বাড়াতে হবে। দেশের যে সমস্ত এলাকা গুলোতে ইতিমধ্যেই করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে, সেসব এলাকায় সন্দেহ ভাজন প্রত্যেককে করোনা পরীক্ষা করার ব্যবস্থা করতে হবে।

মোদ্দা কথা হলো, চিকিৎসা ব্যবস্থাকে যদি আমরা নিশ্চিত করতে না পারি তাহলে বাংলাদেশে মৃত্যুর মিছিল হবে ভয়াবহ। কারণ বাংলাদেশ একটি ক্ষুদ্র তবে অনেক ঘনবসতিপূর্ণ দেশ।
দ্বিতীয়ত, আমাদের সবাইকে ঘরে থাকতেই হবে। নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এমনি পরিবার সমাজকে নিরাপদ রাখতে ঘরে থাকতে হবে। লকডাউন অবশ্যই মেনে চলতে হবে। স্বাস্থ্য বিধি ও সরকারের নির্দেশনা অমান্য করার কোন সুযোগ নেই। অর্থাৎ বর্তমান পরিস্থিতিতে ঘরে থাকার কোনো বিকল্পই নেই। ইসলামী হোক বা অন্য যেকোন ধর্মীয় উপাসনা গুলো ঘরে বসে করাই সর্বোচ্চ শ্রেয়। বিগত পয়লা বৈশাখের কোনো অনুষ্ঠান উদযাপন করা হয়নি। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, অযথা জনসমাগম এড়িয়ে চলার ব্যাপারে আপোষের সুযোগ নেই।
তাই বলা চলে- এই মুহুর্তে সাধারণ ছুটি শিথিলতার সুযোগ নিয়ে জনগণ অযথাই ঘর থেকে বের হবেন, সেই বিবেচনায় সরকার আবার সাধারণ ছুটির সময়সীমা বর্ধিত করেছে। এক্ষেত্রে আরও কঠোরতা আরোপ করতে হবে।
তৃতীয়ত, গুজব বন্ধ করতে হবে। করোনা আক্রান্তের সংখ্যা যখন বাড়ছে, তখন স্বার্থান্বেষী মহল গুজব ছড়িয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত, আতঙ্কিত, অস্থিরতা তৈরির অপচেষ্টা করবেই। ফলে করোনার মহামারী মোকাবেলায় যে মূল লক্ষ্য এবং করণীয় তা ব্যাহত হতে পারে। সে কারণে গুজব বন্ধ করতেই হবে। এ ব্যাপারে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।
চতুর্থত, দরিদ্রদের খাদ্য সংস্থান আরো জোরদার করতে হবে যদিও আমাদের মত দেশে এই ব্যবস্থায় অনেকটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। লকডাউন বা ঘরে থাকা নিশ্চিত করতে গেলে গরীব মানুষ বা পরিস্থিতিতে কর্মহীন মানুষ যেন খাদ্য সংকটে না পড়ে। তাদের খাদ্যের চাহিদা সংকুলান নিশ্চিত করা একান্ত জরুরী।
পঞ্চমত, করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় অন্যান্য সফল দেশের অভিজ্ঞতা গুলোকে কাজে লাগাতে হবে। করোনা মোকাবেলা করে যেসব দেশ ইতিপূর্বে সফল হয়েছে যেমন- চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ানের অভিজ্ঞতা গুলোকে পর্যবেক্ষণ করে বিশ্লেষণ করতে হবে এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে এই অভিজ্ঞতা গুলো কাজে লাগিয়ে আমাদের বাংলাদেশে করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে একটি রূপপরিকল্পনা তৈরি করতেই হবে। এই কাজগুলি করতে পারলে হয়ত দ্রুতই মহামারীর অন্ধকার গহ্বর থেকে আমরা বেরিয়ে সাধারণ জীবনে ফিরতে পারবো।
একটা কথা মনে রাখতেই হবে- আমাদের জন্য প্রথম ও সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আমরা অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ একটি জনপদের বাসিন্দা। আমাদের জন্য কিছু ইতিবাচক দিকও আছে আর তা হলো আমাদের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ হলো তরুণ, তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো। কাজেই মহামারী থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আমাদের যে ইতিবাচক দিকগুলো রয়েছে, সেগুলোকে পরিচর্যা করে করোনা মহামারী মোকাবেলার জন্য এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে কালক্ষেপণ আমাদেরকে এক নিদারুণ ভয়াবহ পরিনতির দিকে ধাবিত করে ফেলতে পারে। সময় এখনই- ঘুরে দাড়াবার। রাস্ট্র যন্ত্রের দ্রুত ও কার্যকরী ভূমিকা বা সিদ্ধান্তই আমাদের ভালো রাখবে।

12

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *