বৈশ্বিক মহামারী করোনাঃ কিছু প্রাসঙ্গিকতা

Uncategorized

এম মুহিবুল হাছান

সমগ্র দুনিয়ার মানুষের মাঝে আজ একটি আতংকের নাম করোনা ভাইরাস। যাকে বৈজ্ঞানিক ভাবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় কভিড-১৯ নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এই ভাইরাস জনিত রোগের প্রাদূর্ভাব এখন সারা দুনিয়া জুড়ে। এমন কোন দেশ নেই যেখানে এর সংক্রমণ পৌছায়নি। ইউরোপের অনেক দেশে এর ভয়াবহ সংক্রমণ মৃত্যুপুরীতে পরিণত করেছে। আমেরিকা, এশিয়া কোথাও ছাড় নেই। বহমান তান্ডবে যেটি আজ বৈশ্বিক মহামারীতে রুপান্তরিত। সমগ্র দুনিয়ার আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানকে পরাস্ত করে চিকিৎসা ব্যবস্থাকে পদদলিত করে তান্ডবের মহোৎসব চালিয়ে যাচ্ছে। আধুনিক চিকিৎসা শাস্ত্রের সকল চেষ্টা আজ চরম ভাবে ব্যর্থ। ফাস্ট ওয়াল্ড খ্যাত তথ্য প্রযুক্তির তীর্থ হিসেবে পরিচিত উন্নত দেশগুলি চরম হতাশার দুরাচলে আত্মসমর্পন করছে এই ভাইরাসের কাছে। সকল ক্ষমতাধর আর প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় সমৃদ্ধ রাস্ট্র আজ অকপটে স্বীকার করছে তাদের চিকিৎসা বিজ্ঞান ব্যর্থ। এই মহামারী এমন পর্যায়ে পৌছেছে যার চরম মূল্যে দিচ্ছে বিশ্ব মানব সভ্যতা। সামগ্রিক ইতিহাসের পর্যালোচনা করলে দেখা যায়,- পৃথীবির সৃষ্টি লগ্ন থেকে মানব সম্প্রদায়ের উপর বিভিন্ন সময়ে মহামারীর প্রকোপ দেখা দিয়েছে। যুগে যুগে এমন অনেক মহামারী দেখা দিয়েছিল যাতে প্রাণ হারাতে হয়েছে মানুষ বা অনেক প্রাণিকূলকে। কিন্তু সেই সকল মহামারী গুলি ছিলো একেকটি এলাকা, অঞ্চল বা দেশ বা বিশ্বের নির্দিষ্ট কোন সম্প্রদায় ভেদে। আজকের বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়া করোনার মত মহামারী অতীতে কখনো দেখা দেয়নি। বর্তমান বিশ্বে জাতিসংঘের তালিকা ভূক্ত প্রায় ২০০ টির মত দেশে সংক্রমণ ঘটেছে এই করোনা ভাইরাস জনিত রোগের প্রাদুর্ভাব। প্রতিনিয়ত মৃত্যুর কূলে ঢলে পড়ছে হাজার-হাজার মানুষ। সাম্প্রতিক এই করোনা ভাইরাস জনিত রোগে আতংকিত সমগ্র দূনিয়া। লক ডাউনের ফলে সীমাহীন দূর্ভোগে কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষ। মহামারী এই ‘করোনা’ শব্দটি বিশ্বের মানুষের মুখে যতটা ধ্বনিত হয়েছে মনে হয় না আর কোন শব্দ এমন হয়েছে। করোনা নামক এই শব্দের প্রতিধ্বনি বহুদিন বহুকাল ব্যাপি মানুষের কর্ণে ঝংকার ছড়াবে। ইতিহাসের পাতায় ভয়াবহতার চরম নৃশংসতার এক অধ্যায়ের জন্ম দেবে। কাল মহাকালে শিহরিত করবে বিশ্বের স্বজন হারানো মানুষকে।

কভিড-১৯ এই করোনা ভাইরাসের জন্ম উৎপত্তি কিভাবে? তা এখনো সমগ্র বিশ্বে ধোয়াশাচ্ছন্ন। তবে সর্বপ্রথম এর সংক্রমণ দেখা দেয় চীনে। সেখান থেকেই বিশ্ব ভ্রমনের যাত্রা শুরু। চীনের উহান প্রদেশ থেকে মৃত্যুদূতের এই ভাইরাসটি যাত্রা শুরু করে ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য সব জায়গায় অপ্রতিরোধ্য দাপুটে অবস্থান করে এশিয়ায় পৌছেছে। আমাদের দেশেও ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। ইতিমধ্যে ভাইরাসটি ছড়ানো শুরু হয়েছে বিভিন্ন অঞ্চলে। সরকার ভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে জনসমাগম, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয় সতর্কতা অবলম্বন করতে দেশের হাট বাজার, সভা সমাবেশে কঠোরতা আরোপ সহ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ছুটি ঘোষনা করা হয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহ সকল অফিস আদালতে। সরকার আজ আবার চতুর্থ দফায় ছুটি বর্ধিত করেছে। প্রশাসন দেশের মানুষের সংক্রমণ নিরাপত্তা সুরক্ষায় কয়েকটি জেলায় করোনায় সংক্রমিত হওয়ায় সেই সব এলাকা এবং সংক্রামিত ব্যক্তির বাড়িকে লক ডাউন করেছেন।

বৈশ্বিক এই মহামারী করোনা পরিস্থিতিতে Lock DOWN (লক ডাউন), Quarantine (কোয়ারেন্টাইন), Isolation (আইসোলেশন) নামক বিদেশী কয়েকটি শব্দ আজ দেশে ঘুরেফিরে সকলের মুখে মুখে। সারা বছর আমাদের মুখে মুখে ছড়িয়ে থাকে নানা বিদেশী শব্দের সমারোহ। আমাদের বাংলা ভাষায় অনেক বিদেশী শব্দের বিপুল এক ভান্ডার স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিলেও এই ক’টি শব্দ আমাদের কাছে পুরোপুরি নতুন ভাবে আবির্ভাব ঘটেছে। আমাদের জন্য নতুন ভাবে আবির্ভাব ঘটলেও সমগ্র বিশ্বে এখন সবচেয়ে বেশি প্রচারিত। জেনে নেওয়া যাক, এ শব্দ গুলি সম্পর্কে আর বর্তমান এই মহামারীতে কেনইবা ব্যবহৃত হচ্ছে এই সকল শব্দের।

✽ Locked DOWN: তালাবদ্ধ রাখা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই লকড ডাউন শব্দের উৎপত্তির একটি অন্যতম কারণ (All Prisoners were Locked up so they could keep casualties to a minimum) যার অনুবাদ করলে দাঁড়ায়= সমস্ত কয়েদীকে তালাবদ্ধ করে রেখেছিল যাতে তারা হতাহতের ঘটনা সর্বনিম্ন রাখতে পারে।

✽ Quarantine: পৃথকীকরণ বা সঙ্গরোধ করিয়া রাখা।
বিশ্বে বিভিন্ন দেশে শব্দটির ব্যবহার (Patients are considered contagious and should remain in quarantine until all scabs separate) যার অনুবাদ করলে অর্থ দাঁড়ায়= রোগীদের সংক্রামক হিসাবে বিবেচনা করা হয় এবং যতক্ষণ না সমস্ত স্ক্যাব পৃথক হয় ততক্ষণ তাকে পৃথক অবস্থায় থাকা উচিত।

✽ Isolation: আলাদা বা বিচ্ছিন্নতা। বিশ্বে বিভিন্ন দেশে শব্দটির ব্যবহার ( a state period or place of isolation in which people or animals that have arrived from elsewhere or been exposed to infectious or contagious disease are placed) যার অনুবাদ করলে অর্থ দাঁড়ায়= রাস্ট্র বা এলাকার জন্য সেই সময়কাল বা বিচ্ছিন্নতার জায়গা যেখানে মানুষ বা প্রাণী যারা অন্য কোথাও থেকে এসেছিল বা সংক্রামক বা সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছে তাদের স্থাপন করা হয়েছে।

করোনা ভাইরাসের সংক্রমনে সমগ্র বিশ্বের ভয়াবহতা প্রেক্ষিতে আমাদের দেশে প্রশাসনের নানা উদ্যোগে আমরা কতটা সচেতন? করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধকল্পে এই শব্দগুলির যথার্থ ব্যবহার করতে পারছি কিনা? যার সঠিক ব্যবহার আমাদেরকে সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম। Lock down (লক ডাউন), Quarantine (কোয়ারেন্টাইন), Isolation (আইসোলেশন) শব্দগুলি সম্পর্কে আমাদের সঠিক ধারনা না থাকার ফলে সংক্রমণ এড়াতে যেমন সচেতনতা তৈরি না করার পরিবর্তে বরং যত্রতত্র এর অপব্যবহার সুরক্ষা কবজকে ধ্বংস করছে।

বিগত ক’দিন থেকে লক্ষ করলাম অনেক এলাকায় গ্রামের যুবক প্রশাসনের অনুমতি ব্যতিত নিজেদের উদ্যোগে গ্রামকে লক ডাউন Lock down ঘোষনা করে চলেছেন। কিন্তু তা সঠিক নয়। গ্রামের রাস্তায় কাগজের একটি টুকরোতে লক ডাউন লিখে বাশ, গাছের ডাল ফেলে রেখে বহিরাগত প্রবেশ নিষেধ করলেই লক ডাউন হয়ে যায় না। এরকম মনগড়া সিদ্ধান্তের ফলে জরুরী পরিসেবা (এম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস, গ্যাস) প্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে জনসমাগম এড়িয়ে চলার সরকারি ও স্বাস্থ্য বিধি থাকা সত্বেও গ্রামের রাস্তায় লক ডাউন ঘোষনা করেও দেখা যায় পাড়া মহল্লার দোকানে আড্ডা, ক্যারম, লুডু খেলাতে তরুণ যুবক এমনকি মধ্যবয়সীরাও মশগুল। ফলশ্রুতিতে লক ডাউনের আসল উদ্দেশ্য কোন ক্রমেই সফল হচ্ছে না। আক্ষরিক অর্থে লক ডাউন কেমন হবে-
☞ সকলে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে নিজ ঘরে অবস্থান করা।
☞ অবশ্যই নিজে সকল জনসমাগম এড়িয়ে চলা।
☞ একান্ত জরুরী প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে না যাওয়া। ☞ জরুরী প্রয়োজন ছাড়া অন্য কোন এলাকায় না যাওয়া।
☞ রাস্তায় এলোমেলো বা অহেতুক ঘোরাফেরা কিংবা আড্ডা দিতে জমায়েত না হওয়া।

মহামারী করোনা ভাইরাস জনিত রোগের সংক্রমণ এড়াতে সরকার ঘোষিত নির্দেশনা ও স্বাস্থ্য বিধি সমুহ মেনে চলার বিকল্প নেই। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে এপ্রিলের এই সময়টা আমাদের দেশে সবচেয়ে ভয়াবহ সময়। আতংক নয় কেবল সচেতনতাই পারবে সবাইকে সুস্থতা দিতে। তাই, নিজের প্রয়োজনে স্বাস্থ্য বিধি ও সরকারের নির্দেশনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হউন। নিজে নিরাপদ থাকুন, সুস্থ থাকুন। পরিবার পাড়া-প্রতিবেশীকে নিরাপদ সুস্থ রাখুন।

লেখকঃ মানবাধিকার কর্মী, তরুন কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক।

24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *